বিশ্বকাপে ব্র্যান্ডের ‘লড়াই’

নাইকি বনাম অ্যাডিডাস

ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াই নয়। এটি বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডের জন্যও একটি বড় প্রতিযোগিতার মঞ্চ।

কোন দল কত গোল করল, কে নকআউট পর্বে উঠল—এসবের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোন ব্র্যান্ডটি দর্শককে বেশি আকর্ষণ করতে পারল।

এবারের বিশ্বকাপকে ঘিরে ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা দুই শীর্ষ ব্র্যান্ড নাইকি ও অ্যাডিডাসের মধ্যে এমন প্রতিযোগিতা লক্ষ করা গেছে। বিজ্ঞাপন, তারকা খেলোয়াড়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও শহরজুড়ে প্রচারণাসহ সব ক্ষেত্রেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে দুই প্রতিষ্ঠান।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে নাইকি তৈরি করেছে ‘রিপ দ্য স্ক্রিপ্ট’ নামের বিজ্ঞাপন। এতে দেখা গেছে ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে, নরওয়ের আর্লিং হলান্ড, পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও বাস্কেটবল তারকা লেব্রন জেমসকে।

অন্যদিকে অ্যাডিডাসের ‘ব্যাকইয়ার্ড লেজেন্ডস’ প্রচারণায় রয়েছেন লামিন ইয়ামাল, জুড বেলিংহ্যাম, লিওনেল মেসি ও জিনেদিন জিদানের মতো তারকারা। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ডেভিড বেকহামের উপস্থিতিও রয়েছে এতে।

দুই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনগুলো দেখতে অনেকটা হলিউড চলচ্চিত্রের ট্রেলারের মতো। এসব প্রচারণার পেছনে ব্যয়ও কম নয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, অ্যাডিডাস বিজ্ঞাপন নির্মাণে প্রায় ৫ কোটি পাউন্ড ব্যয় করেছে। যদিও দুই প্রতিষ্ঠানই আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যয়ের পরিমাণ প্রকাশ করেনি।

ফিফা ঘিরে বিপুল ব্যয়ের বিজ্ঞাপন নতুন কিছু নয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবার দুই ব্র্যান্ড আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো বড় পরিসরে প্রচারণা চালাচ্ছে।

অনলাইনে দর্শকসংখ্যার হিসাবে আপাতত এগিয়ে রয়েছে নাইকি। প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ইউটিউবে নাইকির বিজ্ঞাপনটি প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ বার দেখা হয়েছে। বিপরীতে অ্যাডিডাসের বিজ্ঞাপনের ভিউ ছিল প্রায় ৭০ লাখ।

নাইকি গ্লোবাল ফুটবলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যামিলো আন্দ্রাদে বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে শুধু একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করলেই আর কাজ হয় না। এখন মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়বস্তু নতুনভাবে উপস্থাপন করে এবং নিজেদের মতো করে ছড়িয়ে দেয়। তাই কোম্পানিগুলোর লক্ষ্য এমন এক ফুটবলভিত্তিক জগৎ তৈরি করা, যেখানে সমর্থক, খেলোয়াড় ও কনটেন্ট নির্মাতারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন।’

অন্যদিকে অ্যাডিডাসের বিশ্বকাপের সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপের জন্য প্রতিষ্ঠানটি বিখ্যাত টেলস্টার ম্যাচ বল তৈরি করেছিল। এরপর থেকে বিশ্বকাপের সঙ্গে ব্র্যান্ডটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

অ্যাডিডাসের বিপণন বিভাগের কর্মকর্তা ফ্লোরিয়ান আল্ট বলেন, ‘‌তাদের প্রচারণা সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত। স্থানীয় মাঠ, বন্ধুদের দল ও ফুটবল ঘিরে তৈরি গল্পগুলোকে সামনে আনা হয়েছে এবারের প্রচারণায়।’

নাইকির দোকানে এবার মূলত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এনবিএ চ্যাম্পিয়ন নিউইয়র্ক নিকসকে ঘিরে। ফলে বিশ্বকাপের উপস্থিতি সেখানে তুলনামূলক কম চোখে পড়ে। শুধু দোকান নয়, নিউইয়র্ক শহরের বিভিন্ন স্থানে অ্যাডিডাসের বিশ্বকাপ প্রচারণাই বেশি দৃশ্যমান। শহরজুড়ে বিশেষ প্রদর্শনী, প্রচারণা কেন্দ্র ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বকাপের আবহ তৈরি করার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাডিডাস ফুটবলকে শুধু খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। এটিকে ফ্যাশন ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবেও উপস্থাপন করেছে।

বিশেষ করে জাপান ও কুরাসাওয়ের মতো দলের অ্যাওয়ে জার্সিগুলো (দ্বিতীয় বা বিকল্প ইউনিফর্ম) তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেকের কাছে এসব জার্সি শুধু খেলার পোশাক নয়, বরং পরিচয় ও সংস্কৃতির প্রতীক।

বিশেষজ্ঞ জেমস কার্কহ্যাম বলেন, ‘‌‌বর্তমানে অনেক তরুণ একাধিক দেশের দল অনুসরণ করেন। তারা নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের ভক্ত হন। এর প্রভাব পড়ে জার্সি বিক্রিতেও। বিশ্বকাপে কোন ব্র্যান্ডের জার্সি বেশি দেখা যাবে, সে প্রতিযোগিতাও রয়েছে। এবারের আসরে ১৪টি দলের জার্সি সরবরাহ করছে অ্যাডিডাস। নাইকি সরবরাহ করছে ১২টি দলের। পুমা রয়েছে ১১টি দলের সঙ্গে।’

এছাড়া ফিফা ঘিরে তারকা খেলোয়াড়দের সঙ্গে বুট বা জুতার চুক্তিও বড় ব্যবসা। শীর্ষ খেলোয়াড়দের নিজেদের ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে প্রতিষ্ঠানগুলো। তথ্যানুযায়ী, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে নাইকির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মূল্য বছরে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ এখন শুধু ফুটবলের প্রতিযোগিতা নয়। এটি বিনোদন, ফ্যাশন, প্রযুক্তি এবং বিপণনেরও বড় মঞ্চ। মাঠে দলগুলোর লড়াই যেমন চলবে, তেমনি মাঠের বাইরেও দর্শকের মনোযোগ কাড়তে নাইকি ও অ্যাডিডাসের প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে। —বিবিসি অবলম্বনে

আরও